একজন বাবা কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে , এই গল্প না পড়লে বুঝবেন না

মেয়ে হয়েছে শুনে বাবা আমার মুখটা না দেখেই হাসপাতালের গেট থেকে ফিরে গিয়েছিলেন। কারণ, আমি তার দ্বিতীয় মেয়ে। বাবার স্বপ্ন ছিল, তার ছেলে সন্তান হয়ে বংশের মশাল জ্বালাবো। কিন্তু সে আশা পূরণ হলো না। আমার জন্মের পর থেকে মা’য়ের প্রতি অত্যাচার বেড়ে গেল। দেবর ননদের কথার অত্যাচার চলতে লাগলো। তারা সবসময় বাবার কানভারী করতো, ভাইয়ের বউকে মার খাওয়ানো তো নিত্যদিনের ব্যাপার ছিল। বাবা আমায় কোলে নেয়া তো দুরের কথা, আমাকে সহ্যই করতে পারতেন না। আমার জন্য মায়ের জীবনের এক নতুন চ্যাপ্টার উন্মোচিত হল…

মা কোমরে দড়ি বেঁধে কাজ করতো। মা যখন নড়তো, দোলনাও দুলতো। তখন আমিও দোলনায় দুলতাম। মা মেয়ের ভালবাসার এই দৃশ্য দেখে বাবার সহ্য হল না। মা’কে পেছন থেকে চুলের মুঠি ধরে বাড়ির পাশে পঁচা পানির ডোবায় ফেলে দিল। মা শুধু আমার জন্য পেট ভরে নোংরা পানি খেল। আমার মা সাঁতার জানতো না। দাদী দেখতে পেয়ে ছুটে এসে বাঁচালো। এই বাড়িতে মায়ের পর দাদী আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসতো। দাদি বলতো, “তুই মোর এমবিবিএস ডাক্তার। মোর ডাক্তার লাগেনা, তোর মুখ দেখলে আমি ভালো হয়ে যায়।”

আমার বাবা সরকারি চাকুরীজীবী। আমরা দু’বোন আর এক ভাই। ছোট সংসার। লোকচক্ষুর দৃষ্টিতে আমরা সুখী পরিবার। কিন্তু আমার মা সুখের ‘স’ও দেখতে পাই নি। আর আমি সবচেয়ে বড় অভাগা।আমার জন্মের একবছরের মাথায় মায়ের বুকের দুধের ভাগিদার আমার ছোট ভাইটার জন্ম হল। মায়ের বুকের দুধ ঠিকমত পেলাম না। খাবারের অভাবে অপুষ্টিতে ভুগেছিলাম। গায়ের চামড়াগুলো ঝুলে পড়েছিল, হাটতে পারতাম না। মাটির ঘষায় ফোস্কা পড়ে যেত। আমার জন্য জামা কাপড়, দুধ, চিনি, সুজি কিচ্ছু দিতো না। মা আমাকে আটা গুলে খাওয়াতো। মা আমার জন্য বাবার কাছে কিছু চাইলে, উল্টো মার খেত। অবহেলা অযত্নে বেড়ে উঠতে লাগলাম…

একদিন মা খুব তাড়াহুড়ো করে রান্না করছিলো। বাবা অফিস যাবে, দ্রুত খেতে দিতে হবে। বাবা যখন খাচ্ছিলো, আমি হামাগুড়ি দিয়ে বাবার পাশে বসে ২নম্বর কাজটা করে দিছি। আমি ক্যানো খাওয়ার সময় এটা করলাম? বাবা রাগে ক্ষোভে জলন্ত চুলার খড়ি বের করে আম্মাকে পিটাতে শুরু করলেন। মারের ভয়ে মা আমাকে ওই অবস্থায় কোলে নিয়ে চাচা শ্বশুড়ের বাড়ির খাটের নিচে লুকালো। তখন চাচি বললো, তুই কি অমানুষ হয়ে গেছিস? বউটাকে এমন করে ক্যান মারিস?

তারপরও বাবা মারলো। আম্মা রাগের মাথায় আমাকে কোল থেকে বাবার সামনে মাটিতে আছাড় দিলো, এটা দেখার জন্য যে নিজের সন্তান এর জন্য দরদ আছে কিনা কিন্তু তারপরে মা’কে আরও বেদম পিটিয়েছে। এভাবে রোজ চলতো অত্যাচার।

আমার ফুপুর স্বামী নামকরা উকিল। ওদের অনেক টাকা পয়সা। তবুও ফুপু যখন আমাদের বাড়িতে আসতো, আমার জন্যে তার ছেলের পুরোনা কাপড়গুলো নিয়ে আসতো। ফুপুর ছেলে যখন দেখতো ওর কাপড় জুতা পড়েছি, মারতো আর বলতো আমার কাপড় ক্যান পড়ছিস? তাদের ছোট মস্তিষ্কেও হিংসের প্রতিফলন হতো। এভাবেই বড় হচ্ছিলাম…

একবার ইদের সময় বাবা ঢাকা থেকে তার ভাই বোন, ভাগ্নে ভাগ্নি, ভাইয়ের বউ সবার জন্য কাপড় আনলো। আর মার জন্য এনেছিল একটা কমদামী শাড়ি। কিন্তু আমাদের দু’বোনের জন্য কিচ্ছু আনে নি। আম্মার কমদামী ঐ শাড়ীখানা ছোট ফুপুর এতই পছন্দ হলো যে সেটা নেবার জন্য সে দুদিন মুখ ফুলিয়ে থাকলো। পরে আম্মা বাধ্য হয়ে শাড়িটা দিয়ে দিলো। সেদিন বাবা আম্মার হাতে শাড়ী দিয়ে বলেছিলো, গলায় ফাস দিয়ে মরতে পারিস না। আম্মা তাই করলো, আমাকে বিছানায় বসায় রেখে গলায় ফাঁস জড়িয়ে একবার আমার দিকে তাকালো। আমি নাকি সেদিন মিষ্টি করে একটা হাসি দিয়ে প্রথমবার মা ডাক দিয়েছিলাম। আম্মা গলার ফাঁস খুলে ফেলে, আমাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিয়ে অনেক কেঁদেছিল। আম্মু শুধু ভাবতো, আমি না থাকলে আমার মানিকদের কে দেখবে..।পরের বার ফুপু যখন বেড়াতে আসলো, তার দু মেয়ে পরনে সেই শাড়ী কেটে বানানো কামিজ। মা দেখে আর সহ্য করতে পারে নি, সেদিন মা বালিশে মুখ লুকিয়ে অঝোরে কেঁদেছিল…

১৯৯৪ সালে মা আমাকে পেটে নিয়ে রংপুর মেডিকেলে এক চাকরির পরীক্ষা দিয়েছিল। ওই সময়ে আট জন ছেলেমেয়ের মধ্যে মা প্রথম হয়েছিল। মা’র চাকরি হওয়ার খুশিতে নানু বাড়ির পুরা এলাকায় মিষ্টি বিলিয়েছিলেন। কিন্তু বাবা মাকে চাকরিটা করতে দিলেন না। বললেন, ‘মেয়ে মানুষকে পরপুরুষের সেবা করতে পাঠাবেন না।’মা নিরবে সবকিছু মেনে নিলেন।

যখন আমি ক্লাস ফাইভে, ঠিক বৃত্তি পরীক্ষার দিব এমন সময় সবথেকে বড় ট্যাজেডি সৃষ্টি হল। মা হঠাৎ মানসিক ভারসাম্য হয়ে হারিয়ে ফেললেন। বদ্ধ পাগলের ন্যায় আচরণ শুরু করলো। নিজের মাথায় নিজে আঘাত করে, মুঠো ভরতি মাটি খায়।আমাদের কাউকে চিনতে পারে না। ঔই অতটুকু বয়সে আমি মানসিক শক পেলাম, আপন মমতাময়ী মাকে এরূপে আবিষ্কার করা, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কষ্ট ছিল। এরপর মামারা মাকে নানা বাড়ি নিয়ে গেল। চিকিৎসা করালো, বাবা ভুলেও মায়ের খোঁজ নিত না। এর মধ্যেই বৃত্তি পরিক্ষা দিলাম। মা বিহীন আমার দুর্বিষহ একটা বছর কাটলো। বড় বোন ইন্টার পড়তো, হোস্টেলে ছিল।ওই অবস্থায় আমি বৃত্তি পেলাম। নানা বাড়ি গেলাম, মা সুস্থ হয়ে গেলো আমার রেজাল্ট এর কিছুদিন পর। মা’কে সাথে করে নিয়ে আসলাম। মা আসার পর আবার ওই একই মানসিক অশান্তি, বাবার কোনো পরিবর্তন হলো না। মাকে সবসময় টেনশনহীন থাকার জন্য হাসিখুশিতে রাখতাম, আমার মা সারাদিন কাজ রান্না বান্না করেছে, আমাদের পড়িয়েছেন, স্বামীর বাজে ব্যবহারও সয়ে গেছেন…

আমার তখন হাটতে শিখি নি কিন্তু কথাবলার পাকনা বুড়ি ছিলাম। সারাদিন বকবক করতাম। আমার পাকা পাকা কথা শুনে একদিন বাবা আমাকে বললেন, ‘দুষ্টামি করলে দিবো ফিক্কে আকাশে।’তারপর থেকে বাবা যেই বাড়িতে যেই আসতো আমি তাকেই বলতাম ‘আবুল ফিক্কি।’ আমার বাবার নাম ছিল আবুল হোসেন। দাদিকে বলতাম, ‘দাদি আবুল ফিক্কি’ মানে পুরা বলতে পারতাম না, বাবা যে ফিকে দিতে চাইছে সেই অভিযোগ সবার কাছে করতাম। ওইদিনে জীবনে প্রথমবার বাবা আমার হাত ধরে কাছে টেনে আদর করেছিল। মা বলত, তোর কথার বুলি তোর বাবার পাষাণ মনকে নরম করে ফেলছিল। তখন হাটতে পারতাম না, তাই বাবা রোজ একটা করে ডিম এনে খাওয়ানো শুরু করলো। বাবা সকালে অফিস যাবার সময় আমি পায়ের কাছে এসে বলতাম হামাগুড়ি দিয়ে, ‘আনডি রোজ খাই’। মানে ডিম কে আনডি বলতাম, প্রতিদিন ডিম এনে খাওয়াতো তাই তাকে খেয়াল করে দিলাম আসার সময় ডিম নিয়ে আসার। এভাবে আমার উপর তার কিছুটা দুর্বলতা তৈরি হলো।.হঠাৎ বাবার অন্য এক জায়গায় পোস্টিং হল। উনি সিদ্ধান্ত নিলেন, আমাদেরকে সেখানে সাথে নিয়ে যাবেন। মা ভাবলো, এবার বুঝি সুখ আসলো, নিজের আলাদা সংসার হবে। ননদ, দেবরদের কথার অত্যাচার আর সহ্য করা লাগবে না। বাবার যে জায়গায় পোস্টিং ছিলো সেখানে আমাদের জীবনের ২২বছর কাটলো। আমাদের তিন ভাই-বোন এর স্কুল লাইফ সেখানে কাটলো। আমি অনেক ভালো স্টুডেন্ট ছিলাম। পঞ্চম, অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি, SSC, HSC তে A+ পেয়েছিলাম। বাবার অনেক স্বপ্ন ছিলো, আমি ডাক্তার হবো। রেজাল্টের সুফলে তার কিছুটা আদর পেতাম।

বড় আপার পুরোনো জামাগুলো আমি পরতাম। স্কুলে কেডস জুতা লাগবে, কিন্তু বাবা প্লাস্টিকের জুতা কিনে দিত। বাবা আমাদের পিছনে টাকা খরচ করতে চাইতো না। আমার ভাইটা এক বছরের ছোট হওয়ায় আমার বই আমার ভাই পড়তো। কখনও নতুন বই আমাদের জুটতো না। স্কুলে টিফিনের সময় সবাই যখন আইসক্রিম, আচার, কতো কি না খেতো, তখন আমরা দুভাইবোন কাঠাল গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে ভাবতাম কাঁঠাল পাতাগুলো টাকা হয়ে যায় না।বাবা কোনোদিন ২টাকাও হাতে দিয়ে বলে নি, মিষ্টি কিনে খেও। বাবার টাকার অভাব ছিলো না, কিন্তু সে তার ভাইবোন,তাদের বাচ্চাদের নিয়ে এতোটাই পাগল ছিল যে, সারাজীবন আমাদের হক মেরে ওদের আল্লাদ মিটিয়েছে। তারপরও তার উপর আমাদের কোন অভিযোগ ছিলোনা। কোনোদিন বলিনি, আব্বু আমাকে একটা ঘড়ি কিনে দিবা। আমার একটা ঘড়ির বড় সাধ ছিল….।

বোনটা আমার মাটির মতো শান্ত। ও’তো অভাব শব্দটা কোনোদিন মুখেও আনে নি। ভাই আর আমি পারিনি, চুপ থাকতে থাকতে চেয়ে বসেছি এটা লাগবে, ওটা লাগবে কিন্তু বাবা দেয়নি।আপু ইংলিশে মাস্টার্স। অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা শেষ করল। আপুর একটা নন এমপিওভুক্ত হাইস্কুলে জব হল। কিন্তু সেখান থেকে তেমন কোন বেতন পেত না। যা পেত তাতে হাত শুধু হাতখরচ হত। জব হওয়ার পরও বাবা কেন জানি তার বিয়ে দিতে রাজি না। ডক্টর, ইঞ্জিনিয়ার, বিসিএস ক্যাডার অনেক প্রস্তাব আসলো, তিনি সেসব কানে তোলেন না। নিজের পরিবার নিয়ে এতটাই উদাসীন যে, পরিবারের কার কি দরকার এসব ভাবার টাইম তার নেই। তিনি কিছুতেই রাজী হন না। এরপর আত্নীয়সজন সবাই বোঝাল, ‘আপনার মেয়েরা এতো সুন্দর, ভদ্র, ভালছাত্রী। এত ভালো বিয়ের ঘর আসতেছে আর কতোদিন রাখবেন, বিয়ে দেন।’ অনেক বোঝানোর পর আপুর বিয়ে দিলেন। আলহামদুলিল্লাহ সে এখন সুখে আছে….

আমার মেডিকেলে পড়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু বাসা থেকে আর্থিক সাপোর্ট পেলাম না। মেডিকেলে পরিক্ষা দিলাম, কিন্তু চান্স হলো না। সব ভার্সিটিতে পরীক্ষা দিতে পারি নি, কারন এতো ইউনিটের ফরম তোলার এতো টাকা বাবা দেবেন না। শুধু DU আর JNU তে একটা করে ইউনিটে পরিক্ষা দিলাম, চান্স হল না, অবশেষে রংপুর সরকারি কলেজে উদ্ভিদ বিজ্ঞানে ভর্তি হলাম। কোথাও চান্স না হওয়ায় এই চার বছরের অনার্স জীবনে বাবা আমায় কোন টাকা দিতেন না। টাকার জন্য কারো সাথে মিশতাম না। কারো একদিন খেতে হলে তাকেও খাওয়াতে হবে, এ সাধ্য তো আমার নেই। বাবা এতো বড় জব করে তার মেয়ের ব্যাগে টাকা নেই জানলে, সবাই হাসবে তাই কলেজে যাওয়া বন্ধ করলাম। তিনি শুধু ফরমফিলাপের টাকাটা দিতেন। তিন ভাইবোন বাসায় ব্যাচ পড়ানো শুরু করে নিজের খরচ নিজেরাই চালাতাম। অথচ এই টাকাও তাকে দিতে হবে। ক্যান তাকে দেইনা, এই প্রশ্নেরও সম্মুখীন হয়েছি…

আরও পড়ুনঃ  গুগলে চাকরি করা আ'দিত্যর বে'তন ১.২ কো'টি!

আমার ফুফুগুলো বছরে পাঁচ ছয়বার বেড়াতে আসত। এসেই বাবার কানভারি করতো। এভাবে প্রতিবার মার সাথে বাবার অশান্তি লাগিয়ে যেতো। যাবার বেলায় বাবা তাদের কে শাড়ি, বাচ্চাদের হাতে টাকা, খাবার দাবার বেঁধে দিত। আবার দেবার সময় বাবা বলতো, ‘তোদের যে দিচ্ছি, এরা তো হিংসা করবে।’ বাবার মনের রহস্য আমরা আজও বুঝি নি। বাবা মিথ্যা বলে, তাদের মনে হিংসা তুলতো আমাদের জন্য। ওরা এখন পর্যন্ত আমাদের বিরুদ্ধে সমালোচনা করে, কারন তাদের আস্কারাটা আর কেউ না আমার বাবাই দিয়েছে।ওরা বলে, আমাদের ভাই তোদের ছাড়বে আমাদের কথায়, বাট আমাদেরকে কেউ আলাদা করতে পারবেনা।

হঠাৎ একদিন আমার খালামনিরা বেড়াতে এসে আম্মার মাথার বালিশে একটা তাবিজ পেল। মনের সন্দেহ হওয়ায় আব্বার মাথার বালিশেও তাবিজ পেল। তারপর সারা ঘরবাড়ি তন্ন তন্ন করে খোঁজা হল। আব্বু শোয়ার জায়গায় তোশকের তুলার মাঝে তাবিজ পাওয়া গেল। খুলে দেখলাম, এক তাবিজে আমার মার ছবি, মাথার চুল, ছবিতে মাথার চুল এলোমেলো করা, অন্যটাতে জাফরানের কালি, আর চামচিকার ছালে অনেক কিছু লিখা। নানী চুপ করে সব নষ্ট করে দিলেন। কিছুদিনের মধ্য আর অশান্তি হলো না। বাবা মায়ের মধ্যে মিল দেখে ভাবতাম, এই বুঝি আমাদের সুদিন ফিরলো…। কিন্ত যখনই বাবার বোনরা আসতো আবার অশান্তি, ওরা গেলেই সব ঠিকঠাক। কিন্তু আমাদের সুদিন আর ফিরলো না…

সহ্য আর ধৈর্য ধরে আমার জীবনের ২২টা বছর বছর পার করলাম। আমি সদ্য স্নাতক পাশ করলাম, ফাস্ট ক্লাস ফাস্ট আলহামদুলি্লাহ। জবের জন্য প্রিপারেশন নিচ্ছি, বাট সার্কুলারে অ্যাপ্লিকেশন ফর্ম পূরণ করার টাকা চাইতেই ভাই আর বাবা আমাকে বলে দিলো, ‘একটাকাও দিতে পারবোনা, খাওয়াতে পারবো না, বাড়ি থেকে বের করে দেব।’আমি বছরের পর বছর সহ্য করতে করতে আর পারিনি তাই চিতকার করে বলেছি, পালতে পারবেন নাতো জন্ম দিয়েছেন কেনো? ভাইটা ছেলে মানুষ রাগ করে বলেছে, আপনি কি দেন? আমাদেরকে জামা জুতা কি দেন? কি দেন আপনি?

রাগকরে সাউন্ড সিস্টেম টা ভেঙেছে, উনি পরদিন তার ভাইবোনের কাছে গিয়ে মিথ্যা বলে আসলেন যে, তার ছেলে নাকি তাকে মারতে গেছে। অথচ এত অভাবেও তার একমাত্র ছেলে যে নষ্ট হয়ে যায়নি এটাই তো অনেক।.বাবার আপুর উপরে তার অনেক রাগ। আপুর ইনকাম খেতে পারেনি, তার আগেই বিয়ে দিতে হইছে, আপু বিয়ে না করলে আপুর ইনকাম খেত। গতকাল বাবা মুখফুটে বলেই ফেললো, ‘আমি গাছ লাগিয়েছি কিন্তু ফল খেতে পারিনি, এটাকে টাকা দিয়ে কি হবে? আবার খরচ করে বিয়ে দিতে হবে।’ছোট ভাই একদিন বাবাকে বাড়ি করবার কথা বললে বলে, ‘আমার বাপ কি আমাকে বাড়ি করে দিয়ে গেছে যে তোদের বাড়ি করে দিয়ে যাব। নিজেরা কামাই করে খা।’কোন বাপ কি এতোটা খারাপ হয়? ঘেন্না ধরে গেছে জীবনের উপর, আমার দুষমনেরও যেন এমন বাপ না হয়। আল্লাহ, যদি আমার জব হতো আমি নিজে ডিভোর্স করাতাম আমার মা কে নিয়ে অনেক দূরে চলে যেতাম….

একদিন আম্মা মুখ খুললো. আমার বাচ্চাদের সাথে এতো বৈষম্য ক্যানো আমি সংসার করবো না। সেদিন নানু বললেন, আমাদের বংশে ডিভোর্সি কেউ নেই, কষ্ট করে সহ্য করে যা একদিন তোর সুখ হবে। এভাবে বত্রিশটা বসন্ত কেটে গেল, তাও সেই সুখের দেখা মেলে নি….আমার একটা লং ডিস্টেন্স রিলেশন আছে। এত দুঃখ কষ্ট শোনার মত একজনকে পেয়েছিলাম। নয় বছরের সম্পর্ক। এই সবকিছু যেনে ছেলেটা আমার জীবনে এসেছিলো। আমার ফোনের খরচ সে চালায়। আমি কখনো চাইনি, সে নিজে থেকে দিত।কিন্তু আজকে তার কাছেও আমি হয়তো বোঝা হয়ে গেছি। ঠিকিতো, আমাকে আর কতো টানবে? তাইতো, কথায় কথায় খোটা দেয়। সব জানার পরেও বলে তোমার বাপকে বিয়ের জন্য বলো। ফোনে অনেক টাকা নষ্ট করছি, হাওয়ায় কথা বলছো তো, গায়ে লাগে না, কেমন বাবা তোমার যে মেয়েকে আইবুড়ো করে মেয়ের কামাই খাবে? সে বলে দিলো, আমার ভুল হইছে তোমার মতো ফ্যামিলির মেয়ের সাথে রিলেশন রাখা, না বাপের ভয়ে দেখা করতে পারছো,না রিলেশনের খরচ বেয়্যার করতে পারছো, কি পাইছি আমি তোমার থেকে।

আমি বলেছিলাম আমার সম্পর্কে লয়্যালিটি, পবিত্রতা, অনেস্টি ধরে রেখেছিলাম। হয়তো টাকার সাপোর্ট দিতে পারি নি।একটা মানুষ চারদিক থেকে মানুষিক ভাবে বিধ্স্ত হয়ে যাচ্ছি, টাকাই কি সব জীবনে, টাকার জন্য সেই ছোট্ট থেকে সব সুখ,আল্লাদ, নিজের খুশিগুলোকে স্যাক্রিফাইজ করতে হলো, আর আজ নিজের ভালবাসাটাকেও টাকার জন্য কোরবানি করে দিলাম। কারন আমার ভালবাবা নাই সবার মতো। যার ভালো বাবা নাই তার ভালবাসা থাকতে নাই এতোবছর পরে এসে বুজলাম। তারে বলে দিলাম আমি চাই তুমি সুখে থাকো,আমার হতভাগী কপালের সাথে তোমার ভাগ্যকে বাঁধবো না। তোমাকে সারাজীবনে কিচ্ছু দেইনি, আজ তোমাকে মুক্তি দিলাম, বিয়ে করে নিও। ভালথেকো আমার ভালবাসা।৷৷৷৷৷.

আকাশের মুখ ভার হয়ে আছে, থমকে আছে গাছপালা। মেঘেরা একত্রিত হওয়ার সংকল্প নিয়েছে। জালানার পাশে বসে দুর আকাশে চেয়ে আছি। ভাবছি, কবে থামবে আমার মনের ঝড়?

আরও পড়ুনঃ  যুক্তরাষ্ট্র-অস্ট্রেলিয়াতে মুক্তি পাচ্ছে বাংলাদেশের ছবি মিশন এক্সট্রিম

এ এক অন্যরকম বাবা

লিখা-বাঁধন আহমেদ(এক আপুর জীবন থেকে নেওয়া বাস্তব গল্প। আপুর প্রাইভেসী রক্ষার্থে ব্যক্তি, স্থান, কাল পরিবর্তন করা হয়েছে।)

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

দয়া করে আপনার Ad Blocker টি বন্ধ করুন

অ্যাডের টাকা দিয়েই আমাদের সাইট পরিচালনা করা হয় ‌‌। আপনি দয়া করে আপনার Ad Blocker টি বন্ধ করে আমাদেরকে সাহায্য করুন ‌।