গল্প: বিয়ের প্রথম রাতেই আমার

বিয়ের প্রথম রাতেই আমার শাশুড়ি এসে আমার সাথে খারাপ আচরণ করতে শুরু করলেন। উদ্ধত গলায় তিনি আমায় জিজ্ঞেস করলেন,’তুমি নাকি ডিভোর্সী?এর আগে নাকি অন্য ছেলের সাথে এক বছর সংসার করছো?’শোনে আমি অবাক হলাম।নেহাল কী আগে ভাগে তার মাকে কিছুই বলেনি! কারোর কাছে কিছু না জানিয়ে নিজের ইচ্ছায় বিয়ে করেছে?আমায় চুপ করে থাকতে দেখে আমার শাশুড়ি ধমক দিয়ে উঠলেন। বললেন,’কথা কানে ঢুকে না মেয়ে? তুমি যে ডিভোর্সী এটা আগে বলোনি কেন?’আমি ভয়ে থরথর করে কাঁপছি।কথা বলার সাহসটুকুও হারিয়ে ফেলেছি পর্যন্ত। তবুও বিরবির করে বললাম,’মা, আপনার ছেলে তো সব জেনেই আমায় বিয়ে করেছে। আপনার কাছে—কথাটা শেষ করতে পারলাম না আমি।এর আগেই আমার শাশুড়ি আরেকবার ধমক দিয়ে উঠলেন।বললেন,’কোন সাহসে তুমি আমারে মা ডাকলা? তোমার মতো অসতী মাইয়ার মুখ থেকে মা ডাক শোনার শখ আমার নাই। আমার ছেলে উচ্চ শিক্ষিত হয়ে উচ্চ লেভেলের চাকরি করে তোমার মতো ব্যবহারিত বউ এনে ঘরে রাখবার জন্য না।তোমারে আমি ডিভোর্স দেয়াবো। আগে নেহাল ঘরে ফিরুক।’আমি কাঁদছি। হাউমাউ করে কাঁদছি।বাবা কতোবার নেহালকে বলেছে,নেহাল বাবা, তোমার তো গার্জেন এলো না। তুমি একা একা এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছো এতে তো আমার মেয়ের বিপদ হবে না?দেখো বাবা, আগের বিয়ে সম্পর্কে তুমি সব জানো। সেই ছেলে ছিল মাতাল।পর নারীতে আসক্ত। আমার মেয়ের উপর অত্যাচারও করতো খুব। এই জন্যই তার ডিভোর্স নেয়া। তোমার মতো ছেলের জন্য ভালো ভালো বিয়ে আসবে। তুমি বড় অফিসার। তুমি বরং আরেকটু ভাবো!’নেহাল তখন বলেছিল, আঙ্কেল আমি ভেবেছি।আমি জানি আপনার মেয়ে কতটা লক্ষ্মী। এবং আমি এও জানি আপনি ওকে নিয়ে কতটা বিপদে পড়েছেন।ডিভোর্সী বলে সবাই এড়িয়ে যাচ্ছে।কেউ কেউ বিয়ে করতে চাইলেও মোটা অঙ্কের যৌতুক চাচ্ছে। আবার সেইসব ছেলেদের আগের সংসার আছে। কোন কারণে সেই সংসার ভেঙেছে। সেই সংসারের আবার ছেলে মেয়েও আছে। আমার একটু ত্যাগের জন্য যদি আপনার মেয়ে বিপুলার জীবনটা সুন্দর হয়। আপনি চিন্তা মুক্ত হোন। তবে আল্লাহও আমায় পুরুষ্কৃত করবেন!বাবা তবুও তাকে বললেন,’তোমার মা? তিনি এটা মানবেন তো?’নেহাল হাসলো। হেসে বললো,’একশোবার মানবেন।’তবে এই তার মায়ের মেনে নেয়া।সত্য হলো যে নেহাল তার মাকে আগে ভাগে এই বিষয়ে কিছুই শুনায়নি।আমার শাশুড়ি আমায় এভাবে কাঁদতে দেখে আরও রাগ দেখালেন।রাগ দেখিয়ে বললেন,’এমনে কাদতেঁছো কেন?বাপের মরার খবর আসছে নাকি?হুহ্!ঢংয়ে বাঁচি না।’কথাগুলো বলে শাশুড়ি চলে গেলেন।আমি এখন একা।একা একাই বিছানার উপর জড়ো সড়ো হয়ে বসে কাঁদছি।রাত করে ফিরলো নেহাল।সে ফিরে এসে আমায় দেখে চমকে উঠলো।আমি তখনও কাঁদছি। নেহাল আমায় কান্নারত অবস্থায় দেখে বললো,’কী হয়েছে? কাঁদছো কেন বিপুলা?’আমি কান্নাভেজা গলায়ই বললাম,’আপনাকে কে বলেছিল আমার মতো অসতী ডিভোর্সি মেয়েকে বিয়ে করতে?কেন বিয়ে করলেন?কেন?’নেহাল তার পরনের শার্টটা খুলে আলনার উপর রাখলো। তারপর ধীরে সুস্থে হেঁটে এসে খাটের এক পাশে বসলো। বসে বললো,’আমার লক্ষ্মী বউকে কে কী বলেছে শুনি!’আমি অভিমানের গলায় বললাম,’মা বলেছেন আমায় নাকি এই ঘরে রাখবেন না।ডিভোর্স দেয়াবেন। আপনি মার কাছে আগে এসব বলেননি কেন?’নেহাল অদ্ভুত করে হাসলো। হেসে বললো,’সত্যিই কী মা এসব বলেছেন?’আমি কেঁদে উঠলাম আবার। বললাম,’আমি কী তবে মিথ্যে বলছি আপনার কাছে! আপনি কেন অত দরদ দেখাতে গেলেন। আমার বিয়ে না হলে না হতো।সারা জীবন ঘরে থাকতাম। আপনি আমায় বিয়ে করে কেন আপনার সম্মান হারালেন। আপনার অত বড় চাকরি। উচ্চ শিক্ষিত আপনি। আপনাকে কী এসব মানায়?’নেহাল আবার হাসলো। হেসে বললো,’এখানেই সমস্যা। আমাদের ধ্যান ধারণা উল্টো থাকে সব সময়।আমরা যারা উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেছি তাদের হওয়া উচিত কুসংস্কার শূন্য। কিন্তু আমরা হয়ে যাই কুসংস্কার পূর্ণ।দেখো, বিয়ের ক্ষেত্রে আমাদের নবীজি কী করলেন। তিনি প্রথম যে বিয়ে করলেন খাদিজা রাঃ কে তিনি ছিলেন বিধবা।হযরত আয়েশা রাঃ ছাড়া নবীজির সব স্ত্রীই বিধবা কিংবা অসহায় ছিলেন। নানান সমস্যায় তারা জর্জরিত ছিলেন। আমাদের নবীজি সেইসব অসহায় নারীদের বিয়ে করে আমাদের শিক্ষা দিয়ে গিয়েছেন। তাছাড়া তুমি যদি আমাদের বাঙালিদের মধ্যে তাকাও তবে দেখবে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তার ছেলের জন্য বিধবা বিবাহ করিয়েছিলেন।অথচ তখন হিন্দু সমাজে বিধবা বিবাহ ছিল পাপের সমতুল্য। কিন্তু তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন।এটা পাপ নয় পূণ্য। এবং বিধবা কিংবা ডিভোর্সি মহিলাকে বিয়ে করে কেউ ছোট হয় না বরং সম্মানিত হয়।যদি সম্মানিত নাই হতো তবে নবীজি সাঃ এর এই কাজের প্রশংসা না করে আমরা বরং ঘৃণা করতাম!আমি বুঝতে পারলাম সবকিছু।আমি নিজেও জানি এসব কথা। কিন্তু এসব নিতি নৈতিকতা আর ধর্মের কথা কী আমার শাশুড়ি মা বুঝবেন!আমি নেহালকে বললামও। বললাম,’মা যে রাজি না! তিনি যে আমায় তার পুত্র বধূ হিসেবে গ্রহণ করবেন না?’নেহাল আবার হাসলো। হেসে বললো,’মা এদিকে আসো তো একটু।’নেহালের ডাকের সঙ্গে সঙ্গেই তিনি এসে উপস্থিত।আমি অবাক হলাম। তিনি কী তবে এতোক্ষণ দরজার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন!শাশুড়ি মা এসে বসলেন আমার পাশে। তারপর নেহালকে উদ্দেশ্য করে বললেন,’বিচার দিয়েছে তোর কাছে?’নেহাল মৃদু হেসে বললো,’হুম!’আমার শাশুড়ি মা মিষ্টি করে হেসে বললেন,’বিয়ের প্রথম দিনেই বিচার।আমি কিন্তু এসব মোটেও সহ্য করবো না!’আমার এবার রাগ লাগছে। নেহাল বার বার আমায় লজ্জায় ফেলছে কেন এমন করে! বিয়ে করে এনে অপমানিত করছে।আমার আবার কান্না এসে যাচ্ছে।আমার শাশুড়ি বুঝতে পারলেন আবার আমি কাঁদতে যাচ্ছি।তাই তিনি ছট করে আমার একটা হাত ধরে ফেললেন। তারপর সেই হাত তার কোলের কাছে টেনে এনে বললেন,’বোকা মেয়ে! কেঁদো না।আমি তোমার সাথে মজা করেছিলাম। দেখেছিলাম আমার বউ মা কী করে আমার কাছ থেকে এসব শুনে!আসলে মা আমি যে আগে আচরণটা করলাম তোমার সাথে এটাই আমাদের সমাজ। আমাদের সমাজ এমনটাই ভাবে।সব সময়। কিন্তু আমি এই সমাজকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তোমায় আমার ঘরে তুলেছি মা।আসল কথা হলো কী মা, নেহাল তো তোমার বাবার অফিসের বড় কর্তা।সে নাকি তোমার বাবার কলিগদের থেকে জানতে পেরেছিলো তোমার বিষয়ে। তারপর সব সময় সে আমায় এসে বলতো তোমাদের কথা। তোমার বিয়ে হচ্ছে না। যৌতুক চায় মোটা অঙ্কের।আমি সবকিছু শুনে সিদ্ধান্ত নিলাম আমার ছেলের জন্য তোমায় বউ করে আনবো। এবং সমাজের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিবো,সমাজে অবিবাহিত ছেলেরাই শুধুমাত্র অবিবাহিত মেয়েদের বিয়ে করবে না।বিধবা কিংবা ডিভোর্সি মেয়েদেরও বিয়ে করবে। আমাদের নবীজি সাঃ সহ অনেক বড় বড় মনুষীরা এটা করেছেন।তারা এটা করে দেখিয়ে দিয়েছেন এটা অন্যায় নয় বরং মহৎ কাজ!এটা মানব সেবাও। এবং এটা সমাজের মানুষের জন্য একটা পরম শিক্ষা।’শাশুড়ি মার কথাগুলো শুনে আমি কাঁদছি।সত্যি সত্যি কাঁদছি।আর ভাবছি, পৃথিবীতে আজও এমন ভালো মানুষ আছে!যাদের দম্ভের বিষয় অসহায়কে অবহেলা নয় বরং অসহায়কে সাহায্য করা।কাছে টেনে নেয়া! ‘ #একটি_অন্যরকম_বিয়ের_গল্প#অনন্য_শফিক

আরও পড়ুনঃ  কেন ১ হাজার ১ টাকা পারিশ্রমিকে সিনেমা করছেন সিয়াম আহমেদ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

দয়া করে আপনার Ad Blocker টি বন্ধ করুন

অ্যাডের টাকা দিয়েই আমাদের সাইট পরিচালনা করা হয় ‌‌। আপনি দয়া করে আপনার Ad Blocker টি বন্ধ করে আমাদেরকে সাহায্য করুন ‌।